বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট: উন্নয়নের স্বপ্ন, নাকি বাস্তবতার সঙ্গে সংঘর্ষ?

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বাজেটের ওপর আলোচনায় বিএনপির সংসদ সদস্য ও অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়া এমন কিছু বক্তব্য দিয়েছেন, যা শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই নয়, অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট মহলেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি দলীয় অবস্থানের চেয়ে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে প্রাধান্য দিয়ে ব্যাংকিং খাত, বাজেট ব্যবস্থাপনা, ঋণনীতি, বিনিয়োগ এবং আয় বৈষম্য নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, বিশ্বের প্রায় ৩৫টি দেশে কাজ করার অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন, কোনো দেশের ব্যাংকিং ঝুঁকির সূচক ৬-এর বেশি হলে তা উদ্বেগের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই সূচক অনেক বেশি বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর ভাষায়, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা আজ গভীর সংকটে রয়েছে। 

সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো আমানত ও ঋণের সুদের হারের বিশাল ব্যবধান। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মাত্র ৫ শতাংশের মতো সুদে আমানত সংগ্রহ করা হলেও একজন সৎ উদ্যোক্তাকে ঋণ নিতে গুনতে হচ্ছে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদ। এর ফলে উৎপাদনশীল ব্যবসা নিরুৎসাহিত হচ্ছে, নতুন শিল্প গড়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একটি দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এই ব্যবধান অনেক কম হওয়া উচিত।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ঋণখেলাপি সংস্কৃতি দেশের ব্যাংকিং খাতকে দুর্বল করে দিয়েছে। আগে ৯০ দিন ঋণের কিস্তি বা সুদ পরিশোধ না করলে খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যে নিয়ম ছিল, তা পরিবর্তিত হওয়ায় প্রকৃত খেলাপির সংখ্যা বাস্তবতার তুলনায় কম দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, এর ফলে সৎ ঋণগ্রহীতারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, আর অসাধু ঋণগ্রহীতারা সুবিধা পাচ্ছেন।

বিনিয়োগের গুণগত মান নিয়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তখনই টেকসই হয় যখন বিনিয়োগ নতুন শিল্পকারখানা, উৎপাদন, প্রযুক্তি, কৃষি, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানমুখী খাতে যায়। কিন্তু যদি অধিকাংশ বিনিয়োগ বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট, শপিং মল কিংবা অনুৎপাদনশীল খাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে প্রকৃত অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পায় না। বরং সম্পদের মূল্য বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি এবং সুদের হার বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

জাতীয় বাজেট নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গত প্রায় দেড় দশকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অধিকাংশ বছরই পূরণ হয়নি। অথচ প্রতি বছর উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরে বাজেট প্রণয়ন করা হয়। পরে রাজস্ব ঘাটতি পূরণে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ঋণ এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতির জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

তিনি মনে করেন, বিদেশি ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল বাণিজ্যিক ঋণের পরিবর্তে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB), আইএমএফ বা অন্যান্য বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সংস্থা থেকে স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ গ্রহণ অধিক যুক্তিসঙ্গত।

বাংলাদেশের বাজেটের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা

জাতীয় বাজেটের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধ।


বর্তমানে সরকারি ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে, যা উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য আর্থিক সক্ষমতা সীমিত করতে পারে।


জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR)-এর ওপর দেশের রাজস্ব সংগ্রহের প্রধান দায়িত্ব থাকলেও বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম।


করের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি কমানো এবং ডিজিটাল কর প্রশাসন শক্তিশালী করা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো আগামী অর্থবছরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।

ড. রেজা কিবরিয়া সাধারণ মানুষের জীবনমানের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি বোঝা যায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দিয়ে। একজন দিনমজুর তার দৈনিক আয়ে কতটুকু খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারছেনসেটিই বাস্তব অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

তিনি আরও বলেন, ধনী মানুষের হাতে অতিরিক্ত অর্থ গেলে তার একটি বড় অংশ সঞ্চয়ে চলে যায়। কিন্তু নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের হাতে অতিরিক্ত আয় গেলে তা দ্রুত বাজারে ব্যয় হয়, ফলে ভোগ, উৎপাদন, ব্যবসা এবং কর্মসংস্থানের চক্র সচল থাকে। তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রান্তিক মানুষের আয় বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সবশেষে একটি বিষয় স্পষ্টজাতীয় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক দর্শন, উন্নয়ন কৌশল এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রতিফলন। যে বাজেট বাস্তবসম্মত রাজস্ব পরিকল্পনা, স্বচ্ছ ব্যয় ব্যবস্থাপনা, শক্তিশালী ব্যাংকিং খাত, উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে, সেই বাজেটই দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম।

দেশের অর্থনীতি নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। তবে গঠনমূলক সমালোচনা, তথ্যভিত্তিক আলোচনা এবং বাস্তবসম্মত নীতিগত সংস্কারই হতে পারে একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পথে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।

 

#বাংলাদেশ #জাতীয়_বাজেট #BangladeshBudget #অর্থনীতি #ব্যাংকিং_খাত #রাজস্ব #মুদ্রাস্ফীতি #ঋণখেলাপি #GDP #EconomicReform #PublicFinance #BangladeshEconomy #PolicyAnalysis #EconomicGrowth #Budget2026 

 

Comments

Popular posts from this blog

CeraVe Moisturizing Cream: A Dermatologist-Developed Solution for Deep Skin Barrier Repair

Cetaphil Face & Body Moisturizing Cream: A Professional Review of One of the World's Most Trusted Moisturizers