রেকর্ড বৃষ্টিতে ডুবল রাজধানী, ধেয়ে আসছে বড় দুর্যোগের আশঙ্কা
ঢাকা: টানা ভারী বর্ষণ ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে দেশের রাজধানী ঢাকা এক নজিরবিহীন জলাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে রেকর্ড ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হওয়ায় নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। আবহাওয়াবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে এটি একটি বড় ধরনের মানবিক ও অবকাঠামোগত সংকটে রূপ নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে মাটির স্বাভাবিক ভারবহন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর ফলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভূমি ধস, মাটির নিচে ফাঁপা স্তর তৈরি হওয়া এবং দুর্বল ভবনগুলোতে কাঠামোগত ঝুঁকি বাড়ছে। পুরোনো ও অননুমোদিত ভবনগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, দুর্যোগ শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অন্তত সাতটি জেলা ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। বিশেষ করে বান্দরবান ও কক্সবাজারে পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতেও ভয়াবহ ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে হতাহতের আশঙ্কা রয়েছে।
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট একটি গভীর নিম্নচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর সম্মিলিত প্রভাবে এই অস্বাভাবিক ‘ক্লাউডবার্স্ট’ ধরনের ভারী বর্ষণ দেখা দিয়েছে। এর ফলে স্বল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়ে পরিস্থিতি দ্রুত বিপজ্জনক রূপ নিয়েছে।
রাজধানী ঢাকায় ইতোমধ্যে অবকাঠামোগত ক্ষতির নানা চিত্র সামনে আসছে। দীর্ঘসময় পানি জমে থাকায় অনেক সড়কে ফাটল দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও তৈরি হয়েছে গভীর গর্ত ও সিঙ্কহোল, যা জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। প্রকৌশলীরা সতর্ক করেছেন, ভূগর্ভস্থ স্তরে পানির চাপ বৃদ্ধি পেলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
এছাড়া বহু ভবনের বেজমেন্টে পানি জমে থাকার কারণে মূল স্তম্ভ ও ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কিছু ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
এদিকে, সামনে আরও একটি গুরুতর সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভূগর্ভস্থ বৈদ্যুতিক লাইনে পানি প্রবেশ করায় দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে পয়ঃনিষ্কাশনের পানি বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে মিশে যাওয়ার ফলে নিরাপদ পানির সংকট দেখা দিতে পারে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কলেরা, ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে সতর্কতা জারি করেছেন।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী অন্তত আরও দুই দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দেশের বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকায় ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। দুর্গত জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভবিষ্যতে এ ধরনের চরম আবহাওয়া আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে। তাই তাৎক্ষণিক দুর্যোগ মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন।
বর্তমানে দেশের কোটি মানুষের দৃষ্টি আবহাওয়ার পরবর্তী গতিপ্রকৃতির দিকে। কারণ আগামী কয়েকদিনের পরিস্থিতিই নির্ধারণ করবে এই দুর্যোগ কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে যাচ্ছে।





Comments
Post a Comment