কেন জাপানের দুর্বল ইয়েনকে সমর্থন দিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন?

ওয়াশিংটন-টোকিওর যৌথ মুদ্রা হস্তক্ষেপের পেছনের অর্থনৈতিক বাস্তবতা

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রা জাপানি ইয়েনের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান সম্প্রতি এক বিরল যৌথ মুদ্রা হস্তক্ষেপ (Coordinated Currency Intervention) পরিচালনা করেছে। সাধারণত একটি দেশ অন্য দেশের মুদ্রার মান রক্ষায় সরাসরি অংশ নেয় না। তবে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে ইয়েনের বিশেষ গুরুত্ব এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সম্ভাব্য অস্থিরতার আশঙ্কাই এবার ওয়াশিংটনকে টোকিওর পাশে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পদক্ষেপের লক্ষ্য শুধু জাপানের মুদ্রাকে স্থিতিশীল করা নয়; বরং বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে সম্ভাব্য অস্থিরতা এবং মার্কিন অর্থনীতির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাবও প্রতিরোধ করা।

কী ঘটেছে?

সম্প্রতি মার্কিন ডলারের বিপরীতে জাপানি ইয়েনের বিনিময় হার ১৬৩-এ নেমে যায়, যা ১৯৮৬ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়। এই পরিস্থিতিতে ৩১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ এবং জাপানের অর্থনৈতিক কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে বাজারে হস্তক্ষেপ শুরু করে।

এই পদক্ষেপের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইউরো বিক্রি করে ইয়েন ক্রয় করে, একই সময়ে জাপানও নিজস্ব বাজারে ইয়েন কেনার মাধ্যমে মুদ্রাটির চাহিদা বাড়ানোর চেষ্টা করে। যৌথ হস্তক্ষেপের পর কয়েক দিনের মধ্যেই ইয়েনের কিছুটা পুনরুদ্ধার ঘটে এবং এর বিনিময় হার ডলারের বিপরীতে প্রায় ১৫৭-এ উন্নীত হয়।

ইতিহাসে এর আগে ২০১১ সালের তোহোকু ভূমিকম্প ও সুনামির পর দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠা ইয়েনকে নিয়ন্ত্রণে এবং ১৯৯৮ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান যৌথভাবে মুদ্রা বাজারে হস্তক্ষেপ করেছিল।

কেন এত দুর্বল হয়ে পড়েছে ইয়েন?

বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েনের বর্তমান দুর্বলতা কোনো একক ঘটনার ফল নয়। বরং দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক স্থবিরতা, অতিমাত্রায় শিথিল মুদ্রানীতি এবং সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাসব মিলিয়ে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকে জাপান দীর্ঘ সময় ধরে ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে লড়াই করছে। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক বহু বছর ধরে অত্যন্ত কম, এমনকি নেতিবাচক সুদের হার বজায় রেখেছে। এই নীতি বিনিয়োগ ও ব্যয় বাড়াতে সহায়ক হলেও ইয়েনের ওপর ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করেছে।

দুর্বল ইয়েন একদিকে জাপানের রপ্তানিকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করেছে এবং পর্যটন খাতকে শক্তিশালী করেছে। অন্যদিকে জ্বালানি, খাদ্য ও অন্যান্য আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০২২ সাল থেকে জাপান সরকার কয়েক দফায় কয়েক দশক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে ইয়েনকে সমর্থনের চেষ্টা করেছে। তবে সম্প্রসারণমূলক আর্থিক নীতি এবং তুলনামূলকভাবে নিম্ন সুদের হার সেই প্রচেষ্টাকে সীমিত করে রেখেছে।

যুক্তরাষ্ট্র কেন এগিয়ে এলো?

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র মিত্র দেশ জাপানকে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থও।

জাপানি ইয়েন বিশ্বের তৃতীয় সর্বাধিক লেনদেন হওয়া মুদ্রা। ফলে এর দ্রুত অবমূল্যায়ন বৈশ্বিক আর্থিক বাজার, আন্তর্জাতিক ঋণপ্রবাহ এবং বিনিয়োগ পরিবেশে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলোজাপান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মার্কিন ট্রেজারি বন্ডধারী দেশ। মে মাসের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির হাতে এক ট্রিলিয়নেরও বেশি ডলারের মার্কিন সরকারি বন্ড রয়েছে।

যদি ইয়েনের পতন অব্যাহত থাকত, তাহলে নিজস্ব মুদ্রাকে সমর্থন দিতে জাপান বিপুল পরিমাণ মার্কিন ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করতে বাধ্য হতে পারত। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার বেড়ে যেতে পারে এবং ইতোমধ্যেই ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি জাতীয় ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

এই কারণেই ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে ইয়েনের নিয়ন্ত্রিত স্থিতিশীলতা কেবল জাপানের নয়, বরং বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

এই হস্তক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে?

অর্থনীতিবিদদের মতে, যৌথ মুদ্রা হস্তক্ষেপ স্বল্পমেয়াদে বাজারকে স্থিতিশীল করতে সক্ষম হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি স্থায়ী সমাধান নয়।

বর্তমানে জাপানের নীতিগত সুদের হার ১ শতাংশ, যা ১৯৯৫ সালের পর সর্বোচ্চ হলেও যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য উন্নত অর্থনীতির তুলনায় এখনও অনেক কম। এই সুদের ব্যবধান আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের ডলারের প্রতি বেশি আকৃষ্ট করছে, ফলে ইয়েনের ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে।

বিশ্লেষকদের অভিমত, যদি জাপান ধীরে ধীরে সুদের হার আরও বাড়াতে না পারে এবং মুদ্রানীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন না আনে, তাহলে শুধুমাত্র বাজারে অর্থ ব্যয় করে ইয়েনকে দীর্ঘ সময় শক্তিশালী রাখা কঠিন হবে।

তবে একই সঙ্গে জাপানের নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি কঠিন ভারসাম্যের প্রশ্নও রয়েছে। সুদের হার দ্রুত বাড়ালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে, আবার নিম্ন সুদের হার বজায় রাখলে ইয়েনের ওপর চাপ অব্যাহত থাকবে।

সামনের পথ

বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের এই সমন্বিত পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আর্থিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে অধিকাংশ বিশ্লেষকের মত, বাজারে সাময়িক হস্তক্ষেপের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংস্কারই ইয়েনের স্থায়ী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে।

অর্থাৎ, এই যৌথ উদ্যোগ তাৎক্ষণিক সংকট প্রশমনে কার্যকর হলেও জাপানের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছেকীভাবে প্রবৃদ্ধি ধরে রেখে মুদ্রার প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধার করা যায়। সেই প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে ইয়েনের ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে এর অবস্থান।

Comments

Popular posts from this blog

CeraVe Moisturizing Cream: A Dermatologist-Developed Solution for Deep Skin Barrier Repair

Oil Prices Slide as U.S.-Iran Pause Raises Hopes for Diplomacy, but Supply Risks Persist

ইরান–মার্কিন উত্তেজনা এবং গালফ অঞ্চলের ভবিষ্যৎ: উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে কী ধরনের সংকট সৃষ্টি হতে পারে?